বিশ্বের দরবারে এশিয়ার বৃহত্তম বিল শনবিল

লোকসংস্কৃতির আবহে বর্ণিল শনবিল
দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে শুরু ‘শনবিল উৎসব ২.০’
প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও উন্নয়নের মেলবন্ধনে বিশ্বদরবারে শনবিলকে তুলে ধরার প্রয়াস
শীতের কোমল রোদে ঝিলমিল করা নীল জলরাশি, দূরে ভেসে থাকা মাছধরার নৌকা আর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা সবুজ প্রকৃতি সব মিলিয়ে উৎসবের আগেই যেন সাজে সেজে উঠেছিল এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম জলাভূমি শনবিল। এই অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে সাক্ষী রেখে বরাক উপত্যকার আনন্দপুর এলাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে সূচনা হলো বহুল প্রতীক্ষিত ‘শনবিল উৎসব ২.০’। লোকসংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও প্রকৃতি সংরক্ষণের বার্তা নিয়ে এই উৎসব ইতিমধ্যেই আঞ্চলিক গণ্ডি পেরিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক মঞ্চ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
আসাম বিশ্ববিদ্যালয়, শিলচর এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্ববিদ্যালয়, হোজাই এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত উৎসবের লক্ষ্য কেবল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনে সীমাবদ্ধ নয়। শনবিলকে কেন্দ্র করে একটি সুসংহত সাংস্কৃতিক ও পর্যটন পরিকাঠামো গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। শনিবার সকাল সাড়ে দশটায় প্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ও প্রাক্তন এয়ার চিফ মার্শাল শ্রী অরূপ রাহা। উদ্বোধনী ভাষণে তিনি লোকসংস্কৃতি ও প্রকৃতি নির্ভর পর্যটনের এই যুগলবন্দির ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে। উৎসব মঞ্চে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মানবেন্দ্র দত্ত চৌধুরী শনবিল উৎসবের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, “শনবিল কেবল একটি জলাভূমি নয় এটি এই অঞ্চলের মানুষের জীবনধারা, অর্থনীতি ও লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এই প্রাকৃতিক সম্পদকে সংরক্ষণ করে লোকসংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করা গেলেই প্রকৃত অর্থে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।” তাঁর মতে, এই উৎসবের মাধ্যমে স্থানীয় লোকশিল্পী, আদিবাসী নৃত্যদল, সংগীতশিল্পী ও হস্তশিল্পীরা তাঁদের প্রতিভা প্রকাশের একটি বৃহৎ মঞ্চ পাচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন বিলুপ্তপ্রায় লোকসংস্কৃতির সংরক্ষণ হচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে স্থানীয় শিল্পীদের আর্থিক স্বনির্ভরতার পথও সুগম হচ্ছে। অধ্যাপক চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে ডোনার মন্ত্রকের আর্থিক সহায়তার বিষয়টিও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও প্রসারে ডোনার মন্ত্রকের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আর শনবিল উৎসব সেই পরিকল্পনারই এক বাস্তব উদাহরণ।
উৎসবের প্রধান রূপকার অধ্যাপক অরুণ জ্যোতি নাথ জানান, শনবিল উৎসবের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। পর্যটনের প্রসারে স্থানীয় মানুষের জন্য হোমস্টে, নৌভ্রমণ, হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী খাদ্য সংস্কৃতির মাধ্যমে নতুন আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়টিকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান। আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক রাজীব মোহন পান্ত তাঁর বক্তব্যে বলেন, এই উৎসব বিশ্ববিদ্যালয় ও সমাজের মধ্যে এক দৃঢ় সেতুবন্ধন রচনা করেছে। গবেষণা, সংস্কৃতি ও বাস্তব জীবনের মধ্যে যে দূরত্ব রয়েছে, শনবিল উৎসব তা কমিয়ে আনতে সহায়ক হবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এই উৎসব আরও সমৃদ্ধ হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
একদিন ব্যাপী এই উৎসবে লোকনৃত্য, লোকসংগীত, আদিবাসী সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী খাদ্য ও হস্তশিল্প প্রদর্শনী সহ নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। দূরদূরান্ত থেকে আগত দর্শনার্থীদের ভিড়ে আনন্দপুর এলাকা কার্যত এক মিলন ক্ষেত্রে পরিণত হয়। স্থানীয় মানুষের উচ্ছ্বাস ও আবেগ এই উৎসবকে ঘিরে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। দিনের শেষে শান্তিনিকেতন থেকে আগত বাউল শিল্পী গৌতম দাসের কণ্ঠে বাউল গানের আসর দর্শক-শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে তোলে। পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পীদের নৃত্য ও সংগীত প্রতিযোগিতা এবং উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের নৃত্য পরিবেশন উৎসবের আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে দেয়। আয়োজকদের দৃঢ় বিশ্বাস, ‘শনবিল উৎসব ২.০’ ভবিষ্যতে শুধু একটি বার্ষিক উৎসব হিসেবেই নয়, বরং শনবিলকে কেন্দ্র করে একটি স্থায়ী সাংস্কৃতিক ও পর্যটন পরিচয় গড়ে তুলবে। লোকসংস্কৃতি, প্রকৃতি সংরক্ষণ ও আর্থসামাজিক উন্নয়নের এই সম্মিলিত যাত্রায় শনবিল একদিন বিশ্বদরবারে উত্তর-পূর্ব ভারতের এক অনন্য পরিচয় হয়ে উঠবে এমনটাই আশা সংশ্লিষ্ট সকলের।

(নিউজ ডেস্ক রির্পোট এবি নিউজ)

Comments

Popular posts from this blog

বাংলাদেশের ময়মনসিংহ এর কিছু বাস্তব কথা

রামকৃষ্ণনগরে বজরং দল জেলা কমিটির পুনর্গঠন

আনিপুরের ঘটনাস্থল পরিদর্শনে মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল, দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা ও নতুন সেতু নির্মাণের নির্দেশ