রামকৃষ্ণনগর সম-জেলায় মানবতার নির্মম পরাজয়, সভ্যতার মুখে তীব্র প্রশ্নচিহ্ন

জঙ্গলে মিলল এক নবজাতকের নিথর দেহ
রামকৃষ্ণনগর সম-জেলায় মানবতার নির্মম পরাজয়, সভ্যতার মুখে তীব্র প্রশ্নচিহ্ন

মানবতা কি আজ আর নিরাপদ ? সভ্যতার মুখোশের আড়ালে কি আমরা ধীরে ধীরে নিষ্ঠুরতার দিকেই এগিয়ে চলেছি ? সদ্য পৃথিবীর আলো দেখা একটি নিষ্পাপ নবজাতকের নিথর দেহ জঙ্গলের গভীরে পড়ে থাকার দৃশ্য যেন সমাজের বিবেককে নগ্ন করে দিল। রামকৃষ্ণনগর সম-জেলায় সংঘটিত এই হৃদয়বিদারক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডে শিউরে উঠেছে গোটা এলাকা। স্তব্ধ হয়ে গেছে মানুষের ভাষা, চোখে ভেসে উঠছে অসহায় প্রশ্ন এ কেমন সমাজ, যেখানে জন্মের আগেই মৃত্যুর ফাঁদ পাতা থাকে ? স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বুধবার গভীর রাতে গান্ধীনগর গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত দাস-নয়াগ্রাম এলাকার একটি নির্জন জঙ্গলে কে বা কারা সদ্যোজাত একটি শিশুকে গলায় প্লাস্টিকের রশি পেঁচিয়ে নির্মম ভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। অপরাধ ঢাকতে এবং পরিচয় গোপন রাখতে শিশুটির নিথর দেহ জঙ্গলের মধ্যে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় দুষ্কৃতীরা। রাতের অন্ধকারে ঘটে যাওয়া এই বর্বরতা যেন সভ্য সমাজের মুখে চরম আঘাত।
বৃহস্পতিবার সকালে স্থানীয় কয়েকজন গ্রামবাসী জঙ্গলের ভেতর অস্বাভাবিক কিছু পড়ে থাকতে দেখে এগিয়ে যান। কাছে যেতেই তাঁদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই বিভীষিকাময় দৃশ্য একটি নিষ্পাপ নবজাতকের নিথর দেহ। মুহূর্তের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক ও শোক। কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেকে, কেউ কেউ বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। খবর দেওয়া হয় কালিবাড়ি পুলিশ ফাঁড়িতে।
সংবাদ পেয়ে কালিবাড়ি পুলিশ ফাঁড়ির সমর বর্মন ও উনার পুলিশ বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে এলাকা ঘিরে ফেলে। শুরু হয় প্রাথমিক তদন্ত। পরবর্তীতে বিষয়টি রামকৃষ্ণনগর থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক (ওসি) তিলক তেরন
-কে জানানো হয়। পাশাপাশি ভৈরবনগর উন্নয়ন খণ্ডের বিডিও উত্তরা পাল কেও ঘটনা সম্পর্কে অবগত করানো হয়। প্রশাসনের একাধিক স্তরের আধিকারিক ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন। পুলিশ প্রশাসনের উপস্থিতিতে নবজাতক শিশুটির মৃতদেহ উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয় এবং ময়নাতদন্তের জন্য শ্রীভূমি জেলা হাসপাতালে পাঠানো হয়। প্রশাসন সূত্রে জানা যায় যে, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ধারণ করা হবে এবং তার ভিত্তিতে তদন্তের গতি আরও জোরদার করা হবে। পুলিশ সূত্রে আরো জানা যায় যে, তদন্তের স্বার্থে একাধিক দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শিশুটির জন্ম কোথায় হয়েছে, কোনও স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা বাড়িতে কি সদ্য প্রসবের ঘটনা ঘটেছে, কোনও অবৈধ সম্পর্ক, সামাজিক ভয়, লজ্জা, কুসংস্কার কিংবা চরম দারিদ্র্য কি এই ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে সব সম্ভাবনাই খোলা রাখা হয়েছে। আশপাশের এলাকায় জিজ্ঞাসাবাদ চলছে, স্বাস্থ্যকর্মী ও আশা কর্মীদের থেকেও তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হচ্ছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুধু একটি অপরাধ নয়, সমাজ ব্যবস্থার গভীর ক্ষয়ও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যেখানে একটি শিশুর জন্ম হওয়া মানেই আনন্দ, আশার আলো ও নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন সেখানে সেই জন্মই যদি অপরাধে পরিণত হয়, তবে তা সমাজের জন্য চরম লজ্জার। প্রশ্ন উঠছে আজও কি সামাজিক সচেতনতার অভাব এতটাই প্রকট যে মানুষ নিষ্পাপ প্রাণকে হত্যা করতেও দ্বিধা করে না ? প্রশাসনিক নজরদারি ও সামাজিক নিরাপত্তার কাঠামো কি যথেষ্ট শক্তিশালী ? স্থানীয় বাসিন্দারা এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, দোষীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন বর্বরতা ঘটানোর সাহস না পায়। একই সঙ্গে সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে নারী ও শিশু সুরক্ষায় প্রশাসনিক নজরদারি আরও জোরদার করার দাবি উঠেছে। এই ঘটনায় রামকৃষ্ণনগর সম-জেলাজুড়ে শোক ও ক্ষোভের আবহ বিরাজ করছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন যে, সমাজ শিশুদের ভবিষ্যৎ বলে গর্ব করে, সেই সমাজেই যদি নবজাতক নিরাপদ না থাকে, তবে উন্নয়ন, সভ্যতা ও মানবিকতার দাবি কোথায় দাঁড়ায় ?
আজ প্রশাসনের তদন্তের দিকে তাকিয়ে আছে গোটা এলাকা। তবে শুধু তদন্তেই দায় শেষ নয় এই ঘটনার পর সমাজ ও প্রশাসন যদি আত্মসমালোচনায় না নামে, যদি সচেতনতা ও মানবিক মূল্যবোধ পুনর্গঠনের চেষ্টা না হয়, তবে এমন নিষ্ঠুরতার পুনরাবৃত্তি যে কোনও সময় আবার ঘটতে পারে। এই নবজাতকের নীরব মৃত্যু যেন আমাদের সকলের বিবেককে জাগিয়ে তোলে এই হোক একমাত্র প্রত্যাশা।

(নিউজ ডেস্ক রির্পোট এবি নিউজ)

Comments

Popular posts from this blog

বাংলাদেশের ময়মনসিংহ এর কিছু বাস্তব কথা

রামকৃষ্ণনগরে বজরং দল জেলা কমিটির পুনর্গঠন

আনিপুরের ঘটনাস্থল পরিদর্শনে মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল, দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা ও নতুন সেতু নির্মাণের নির্দেশ