“নারীর জাগরণেই সমাজের অগ্রযাত্রা: কালিনগরে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে সচেতনতার আবেগঘন অঙ্গীকার”
হীরক বণিক, রামকৃষ্ণনগর, ২৫ এপ্রিল:-
শনিবার কালিনগর গ্ৰাম পঞ্চায়েত কার্যালয় যেন এক অনন্য আবেগ, সচেতনতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার মিলনমেলায় পরিণত হয়। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিক উদযাপন ছিল না; বরং এটি ছিল নারীর অধিকার, সম্মান, শিক্ষা এবং আত্মমর্যাদার প্রশ্নে এক গভীর চিন্তন ও আত্মসমালোচনার মঞ্চ। আসাম কলেজ শিক্ষক সংস্থা করিমগঞ্জ হাইলাকান্দি জোনের উদ্যোগে, রামকৃষ্ণনগর কলেজ ইউনিট ও মহিলা কোষের আয়োজনে এবং কালিনগর গ্ৰাম পঞ্চায়েতের আন্তরিক ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠিত এই সচেতনতা সভা এক নতুন বার্তা বহন করে সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন নারী ও পুরুষ সমান ভাবে এগিয়ে যাবে। যদিও ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আসাম কলেজ শিক্ষক সংস্থা করিমগঞ্জ হাইলাকান্দি জোনের গৃহিত কার্যসূচির অংশ হিসেবে শনিবার কালিনগর গ্ৰাম পঞ্চায়েত কার্যালয়ে এক সচেতনতা সভার আয়োজন করা হয়। আর
অনুষ্ঠানের সূচনা থেকেই পরিবেশ ছিল ভাবগম্ভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ। উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, শিক্ষক-শিক্ষিকা, সমাজকর্মী এবং এলাকার সাধারণ মানুষ। সভায় সভাপতিত্ব করেন আসাম কলেজ শিক্ষক সংস্থা করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি জোনের সভাপতি ড. বাহার উদ্দিন লস্কর। তাঁর ভাষণে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের তাৎপর্য গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়। তিনি বলেন, “নারী দিবস কোনও একদিনের অনুষ্ঠান নয়, এটি একটি চলমান আন্দোলনের প্রতীক যেখানে নারীর সম্মান, নিরাপত্তা এবং সমঅধিকারের প্রশ্ন সর্বদা প্রাসঙ্গিক।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে নারীর অবদান অনস্বীকার্য, কিন্তু সেই অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি অনেক ক্ষেত্রেই দেওয়া হয়নি। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে সমাজের প্রত্যেক স্তরে নারীর অধিকার নিশ্চিত করা শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং একটি সভ্য সমাজের পরিচয়। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রামকৃষ্ণনগর স্বাস্থ্য কেন্দ্রের চিকিৎসক ডা. ফেরদৌস খান। তিনি তাঁর বক্তব্যে নারীদের স্বাস্থ্য সচেতনতার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “একজন সুস্থ নারীই একটি সুস্থ পরিবার এবং একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি। কিন্তু দুঃখজনক ভাবে এখনও বহু নারী নিজেদের স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন নন, কিংবা সচেতন হওয়ার সুযোগ পান না।” তিনি মাতৃস্বাস্থ্য, পুষ্টি, মানসিক স্বাস্থ্য এবং প্রাথমিক চিকিৎসার গুরুত্ব সম্পর্কে বিশদভাবে আলোচনা করেন। অন্যদিকে বিশিষ্ট আইনজীবী সুব্রত চক্রবর্তী তাঁর বক্তব্যে নারীদের আইনি অধিকার নিয়ে আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, “আইন নারীদের অনেক অধিকার দিয়েছে, কিন্তু সেই অধিকার সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে অনেক নারী আজও বঞ্চিত হচ্ছেন।” তিনি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, সম্পত্তির অধিকার, কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা এবং আইনি সহায়তার বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন এবং সকলকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান। তবে এই অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল সংস্থার সহকারী সম্পাদিকা (মহিলা) ড. লীনা চক্রবর্তীর হৃদয়স্পর্শী বক্তব্য। তাঁর কথায় ছিল একদিকে বাস্তবতার নির্মমতা, অন্যদিকে ছিল পরিবর্তনের দৃঢ় প্রত্যয়। তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “আমরা আজ নারী দিবস উদযাপন করছি, কিন্তু আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করতে হবে- আমরা কি সত্যিই নারীদের সেই সম্মান, সেই অধিকার দিতে পেরেছি, যা তারা প্রাপ্য? আজও বহু মেয়ে শুধুমাত্র মেয়ে হওয়ার কারণে তাদের স্বপ্ন ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। তাদের শিক্ষা থেমে যায়, তাদের কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে যায়।” তিনি আরও বলেন, “একজন শিক্ষিত নারী মানে শুধু একজন ডিগ্রিধারী মানুষ নয়; তিনি একজন সচেতন নাগরিক, একজন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি, একজন শক্তিশালী সমাজ নির্মাতা। শিক্ষা নারীর জীবনে শুধু আলোর প্রদীপ নয়, এটি তার অস্তিত্বের ভিত্তি। শিক্ষা তাকে শেখায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে, নিজের অধিকার দাবি করতে, এবং সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে।”
ড. চক্রবর্তীর বক্তব্যে উঠে আসে সমাজের এক কঠিন বাস্তব চিত্র-যেখানে এখনও বহু পরিবারে মেয়েদের শিক্ষাকে অপ্রয়োজনীয় মনে করা হয়, যেখানে অর্থনৈতিক সংকটের প্রথম বলি হয় মেয়েদের পড়াশোনা। তিনি এই মানসিকতার পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে বলেন,
“যে সমাজ তার কন্যাদের শিক্ষিত করতে পারে না, সেই সমাজ কখনও প্রকৃত অর্থে উন্নত হতে পারে না। আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব-আমাদের ঘর থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি স্তরে নারীদের শিক্ষার পথকে সুগম করা।” অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্যান্য বক্তারাও নারীর অধিকার, মর্যাদা এবং ক্ষমতায়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন। সংস্থার সম্পাদক বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য, সেন্ট্রাল কমিটির সদস্য মনোজিৎ পুরকায়স্থ, ড. রুপালি দাওলাগাজাও, ড. লক্ষী নাথ, ড. মেমচাতন সিংহ, ড. অঞ্জনা চক্রবর্তী, ড. জামাল উদ্দিন, দেবজ্যোতি শর্মা, সত্যজিৎ দেব এবং হীরেশ বিশ্বাস প্রমুখ তাঁদের বক্তব্যে এক সুরে বলেন- নারীর উন্নয়ন ছাড়া সমাজের উন্নয়ন অসম্ভব। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কালিনগর গ্ৰাম পঞ্চায়েতের সভাপতি সত্যজিৎ দেবের উদ্যোগে এলাকার বহু নারী ও পুরুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। তাঁদের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, সমাজে সচেতনতার আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের মূল বার্তা- সমতা, সম্মান এবং অধিকার-এই অনুষ্ঠানের প্রতিটি মুহূর্তে প্রতিফলিত হয়। বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, নারীদের শুধুমাত্র ঘরের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে সমান সুযোগ দিতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারলেই একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। এই অনুষ্ঠান শুধু একটি দিবসের উদযাপন নয়, এটি ছিল এক নতুন চিন্তার সূচনা। এটি মনে করিয়ে দেয়-নারীর প্রতি সম্মান দেখানো কোনও দয়া নয়, এটি একটি মৌলিক মানবিক কর্তব্য। নারীর অধিকার রক্ষা মানেই সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করা। সর্বোপরি, কালিনগরের এই সচেতনতা সভা এক গভীর বার্তা দিয়ে যায়-নারীর জাগরণই সমাজের প্রকৃত অগ্রযাত্রার পথপ্রদর্শক। যখন একটি মেয়ে শিক্ষার আলো পায়, তখন শুধু একটি জীবন নয়, একটি প্রজন্ম আলোকিত হয়। আর সেই আলোর পথেই এগিয়ে যাবে আগামী দিনের সমাজ- সমতা, মর্যাদা এবং মানবিকতার এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে।
Comments
Post a Comment